অন্ধকার মাদ্রাসার রুমে সুলেমানের রক্ত-জাগা রাত
(মাদ্রাসার এক ছাত্রের কাছে শোনা সত্য ঘটনা)
’৬০-এর দশকের গল্প। পুরনো মাদ্রাসার হোস্টেলটা তখনই
কুখ্যাত – রাতে তালা
নাকি নিজে নিজেই খুলে যায়, আর ভোরের ঠান্ডা বাতাসে
শোনা যায় হালকা ফিসফিস। তবে আমরা তিন ছাত্র সেইসব কথায় বিশ্বাস করতাম না।
আমাদের রুমে আমরা ৩ জন থাকতাম। একজন সব সময় পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকত। আর থাকত
সুলেমান – চোখে এক ধরনের কৌতূহল-মেশানো শূন্যতা, আর মুখে সবসময় অদ্ভুত হাসি। সবাই বলত, “ওর মধ্যে আসর জ্বিন লুকিয়ে আছে।” আমরা মনে করতাম ছেলেমানুষি
কথা। এরপর যা দেখেছিলাম… আজও লিখতে গায়ে কাঁটা দেয়।
প্রথম রাত: দশ ফুট লম্বা হাত
সেই রাতে জানালাটা খোলা ছিল। ঠান্ডা বাতাস ঢুকছিল। ঘুম এমনভাবে এসেছিল যে আমি
স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝামাঝি কোথাও ভাসছিলাম।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল – কিন্তু পুরো নয়। ভয় লাগছিল, তাই চোখ পুরো খুললাম না। অল্প খুলে দেখলাম…
সুলেমান তার বিছানায় শুয়ে আছে।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে – সে জানালার দিকে তাকিয়ে হাত বাড়ালো। জানালাটা তার বিছানা থেকে অন্তত দশ ফুট দূরে।
এবং তার হাত লম্বা হতে হতে জানালার কাছে গিয়ে টক করে জানালাটা বন্ধ করে দিল।
মুহূর্তের জন্য আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
আমি নড়লাম না। কারণ নড়লেই সে বুঝে ফেলবে আমি জেগে আছি।
পরদিন সকাল বেলা উঠে নিজেকে বোঝালাম –
“ঘুমের ঘোরে ভুল দেখেছি।”
কারণ সত্যি হলে তো… মানুষ পাগল হয়ে যাবে।
দ্বিতীয় রাত: চিবানোর শব্দ
যে রাতটা সব বদলে দিয়েছিল।
যে রাতের পর আমাদের জীবনে আর আগের মতো সকাল হয়নি।
রাত তখন গভীর। পুরো মাদ্রাসা অন্ধকার আর ঠান্ডায় হিম।
হঠাৎ চিবানোর শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল।
চটচট… চিবচিব… হাড় ভাঙার মতো শব্দ।
আমার শরীরে ঝড় বয়ে গেল।
আবার আগের মতো চোখ অল্প খুললাম।
চোখ খুলতেই দেখি –
সুলেমান বিছানায় বসে আছে।
তার দুই হাত আর মুখ রক্তে ভেজা।
সে চিবোচ্ছে…
কিছু একটা নয় –
আমাদের রুমের আরেক ছাত্রটিকে।
মৃত ছাত্রটির গলা থেকে কাঁধ পর্যন্ত ভয়ানক দাগ, মাংস ছিঁড়ে ফেলা…
আর সুলেমানের সেই লম্বা হাত –
এবার আরও লম্বা –
প্রায় সাপের মতো মোচড় খাচ্ছে,
শরীরের ভেতরে ঢুকে মাংস তুলে আনছে।
আরেকটা ভয়ঙ্কর জিনিস লক্ষ করলাম –
সুলেমান খাওয়ার সময় গলায় মানুষের গলা নয়,
খুব ভারী ধাতব শব্দে খেকখেক করছে,
যেন সে কোনো মানুষের নয়,
বরং শত বছর ধরে কবরের নিচে থাকা কিছু…
এখন আলোয় ফিরে এসে মানুষের ছদ্মবেশ নিয়েছে।
আমি নড়লাম না।
চিৎকার করলাম না।
চোখ পুরো খুললাম না।
শুধু অপেক্ষা করলাম।
যখন সে থামবে, মাথা তুলবে,
আর সেই রক্ত-মাখা মুখ নিয়ে আমার দিকে তাকাবে।
এক মুহূর্তে তার মাথা ঘুরে আমার দিকে তাকিয়েও ছিল।
অথচ আমি চোখ বন্ধ রাখা সত্ত্বেও জানি,
সে আমাকে দেখতে পেয়েছিল।
আমি সেই দৃষ্টির তাপ অনুভব করেছিলাম।
পরদিন…
পরদিন সকালে পুলিশ এসে মৃতদেহ পেল।
কেউ জানত না কীভাবে ছাত্রটি মারা গেল কেউ জানলও না।
সুলেমান অদৃশ্য – যেন সে কখনো ছিলই না।
তার বিছানা, বই, জামা – সব যেন কেউ
রাতারাতি সরিয়ে ফেলেছে।
আর আমি?
আজও রাতে ঘুমাতে গেলে জানালার দিকে তাকাতে ভয় পাই।
মাঝে মাঝে ঠান্ডা বাতাসে মনে হয় অদ্ভুত চিবানোর শব্দ আসছে…
আর তাতে মনে হয়—
সুলেমান এখনও আমার রুমে বসে আছে,
এবার আমাকেই খেতে।

Comments
Post a Comment