শেষ বেতন – ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা আত্মাদের বেতনের দিন

 


রাতের সাভারে এখন আর কেউ রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের কাছে যায় না। সন্ধ্যা নামলেই জায়গাটা যেন অদৃশ্য শ্বাস নেয় ঠান্ডা, ভারী, কষ্টে ভরা।

 

তবু মাঝে মাঝে সেখানে দেখা যায় এক বৃদ্ধাকে। সাদা শাড়ি, মাথায় ছেঁড়া আঁচল। তিনি ধ্বংসস্তূপের ভাঙা দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে কারও জন্য অপেক্ষা করেন। মানুষ তাকে ডাকে শহীদা বুড়ি।”

 

কথা আছে, তার মেয়ে মারা গিয়েছিল রানা প্লাজা ধসে। সেই মেয়ের লাশও পাওয়া যায়নি।

কিন্তু শহীদা বুড়ি বলে:

ও তো অহনও আহে … বেতন লইয়া।”

 

লোকজন প্রথমে ভেবেছিল বৃদ্ধার মানসিক সমস্যা। কিন্তু এক নিরাপত্তাকর্মী, নাম জাফর, এক রাতে গেটের কাছে এক অদ্ভুত ঘটনা দেখল

 

মধ্যরাত

 

চারপাশ নিস্তব্ধ। হঠাৎ ভেতর থেকে ক্ষীণ আওয়াজ

হাতুড়ির টুংটাং… লোহার ঘর্ষণ… সেলাই মেশিনের টক-টক-টক…

 

জাফর টর্চ নিয়ে একটু এগোতেই দেখল ধুলো আর অন্ধকারের ভেতর যেন আলতো আলোর রেখা দুলছে।

আর সেই আলোয় চারপাশ জমে উঠছে নিঃশব্দ ছায়ায়।

 

তারা সবাই মাথা নিচু করে কাজ করছে।

যেন ২০১৩ সালের সকালটা কখনো শেষ হয়নি।

 

একসময় সেই ছায়াদের ভিড় থেকে বেরিয়ে এলো একটি মেয়ে।

এক হাতে ছেঁড়া আইডি কার্ড, অন্য হাতে একটা মলিন খাম।

 

মেয়েটা এগিয়ে গিয়ে শহীদা বুড়ির সামনে দাঁড়াল।

বৃদ্ধা কাঁপা কণ্ঠে বললেন,

মা… আজও?”

 

মেয়েটা মাথা নাড়ল।

ধুলোভরা বাতাসে তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল,

বেতন পাইলাম মা… কিন্তু বাড়ি ফিরনের রাস্তা পাই না।”

 

শহীদা বুড়ি কাঁদতে কাঁদতে মেয়ের হাত ধরতে গেলেন, কিন্তু হাতটা বাতাসে মিলিয়ে গেল।

 

মেয়েটা বলল,

আমরা যারা ভিতরে আটকাইয়া আছিলাম…

যাগো লাশ পায় নাই…

আমরা অহনও ডেডলাইন মিস করতে পারি না…”

 

সে ঘুরে যেতে যেতে ফিসফিস করে বলল

মা, আলো দেখলেই ডরাই…

আমরা কেউ বাঁচতে পারি নাই

 

তারপর সেলাই মেশিনের শব্দ হঠাৎ গর্জে উঠল।

সারা রাত ধ্বংসস্তূপ কেঁপে কেঁপে উঠল।

 

জাফর ভয় পেয়ে পেছাতে গিয়ে দেখল তার পায়ের কাছে পড়ে আছে খামটা।

খাম খুলতেই দেখল ভেতরে ৩০ দিনের বেতন…

আর একটি নোট

 

যারা আটকা পড়ছি,

আমরা বাঁচতে পারি নাই।

তবুও আমাগো বেতন থামে নাই।

আমাগো কাম এহনও শেষ হয় নাই।“

 

পরদিন সকালে জাফর চাকরি ছেড়ে দেয়।

কিন্তু সে আজও বলে

রানা প্লাজায় মৃতদের কবর আছে।

কিন্তু তাদের আত্মাদের ডেডলাইন নেই।”


Comments

Popular posts from this blog

ধ্বংসস্তূপের ভেতর এখনও মেশিনের শব্দ

অন্ধকার মাদ্রাসার রুমে সুলেমানের রক্ত-জাগা রাত