ধ্বংসস্তূপের ভেতর এখনও মেশিনের শব্দ

 


সাভারের সেই ধ্বংস্তুপে রাত নামলেই যেন বাতাসের গায়ে একটা কাঁপুনি লেগে থাকে। চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু মাঝে মাঝে কুকুর ডাকে। কিন্তু গভীর রাতে, যখন শহর ঘুমিয়ে যায়, ঠিক তখনই ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ভেসে আসে অদ্ভুত এক শব্দ—

চিঁ চিঁ চিঁ…
টক-টক-টক-টক…

সেলাই মেশিনের শব্দ।

যেন হাজার মানুষ একসাথে কাপড় সেলাই করছে।

অনেকেই প্রথমে ভেবেছিল বাতাসে দুলে থাকা টিন বা পাথরের শব্দ। কিন্তু এক রাতে পাশের নিরাপত্তাকর্মী করিম আরেকটু এগিয়ে শুনলো—

সেলাইয়ের ফাঁকে ফাঁকে চাপা আওয়াজ,

“টার্গেট মিট করতে হবে… গতকাল ডেলিভারি হয়নি…”
“ম্যাডাম রাগ করবেন না তো…?”

ভয় তাকে জমিয়ে ফেলল। কারণ এ জায়গায় তো এখন আর কেউ কাজ করে না। ২০১৩ সালের সেই ভয়াবহ ধসের পর এখানে শুধুই স্মৃতি, কান্না আর থেমে যাওয়া মানুষের গল্প।

এক রাতে করিম সাহস করে ধ্বংসস্তুপের ভেতরে ঢুকে পড়ে। টর্চের আলো ফেলতেই সে দেখল—ধুলোঝড়ের মতো আলোর ভেতর দাঁড়িয়ে আছে অস্পষ্ট সব ছায়া।

তারা বসে আছে পুরনো সেলাই মেশিনের সামনে। যেসব মেশিন ধ্বংসস্তূপে পিষে গিয়েছিল, সেগুলোই যেন আবার দাঁড়িয়ে গেছে। আর সেই ছায়ারা মাথা নিচু করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ একটা ছায়া মুখ তুলে তাকাল। মুখ নেই, চোখ নেই—শুধু গভীর কালো শূন্যতা।

ছায়াটা বলল,

“ডেলিভারি শেষ না হলে আমরা যেতে পারি না।”

আরেকটা ছায়া চাপা গলায় বলল,

“আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম বিদেশি ক্রেতাদের… টার্গেট পূরণ না করে যেতে নেই…”

করিম ভয় পেয়ে পেছাতে লাগল, কিন্তু শুনল আরেকটা কণ্ঠ, ভাঙা আর কর্কশ—

“আমাদের শরীর গেছে… কিন্তু ডেডলাইন যায়নি…”

ঠিক তখনই সব মেশিন একসঙ্গে কাঁপতে শুরু করল।

চিঁ চিঁ চিঁ…
টক-টক-টক-টক-টক!

শব্দটা এত জোরে হচ্ছিল যেন পুরো রাত আছড়ে ভেঙে ফেলবে।
মুহূর্তের মধ্যে বাতাস ঠান্ডা হয়ে গেল।

কারও ফিসফিস—

“শ্রমিকদের মৃত্যু থেমেছে… কিন্তু তাদের কাজ থামেনি…”

করিম দৌড়ে বেরিয়ে আসলো। পরদিন সুযোগ পেয়ে কাজ ছেড়ে দিল। আজও সে বলে—

“রানা প্লাজায় মানুষ মারা গেছে সত্যি… কিন্তু আরেক সত্য হলো, তারা কেউ ডেডলাইন মিস করেনি।”
কারণ বলা হয়—

ভবনের ভেতরে এখনও কাজ চলছে। এখনও পোশাকের ভাগ্য লেখা হচ্ছে। আর রাত হলে ধ্বংসস্তূপে ফিরে আসে সেই পরিশ্রমী আত্মারা—যাদের কাজ শেষ হয়নি কখনো…

Comments

Popular posts from this blog

অন্ধকার মাদ্রাসার রুমে সুলেমানের রক্ত-জাগা রাত

শেষ বেতন – ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা আত্মাদের বেতনের দিন